অধুরি কাহিনী ১



“পুজোর প্রেম”
ইন্দ্রজিৎ গোস্বামী



অনেক প্রেম শেষ হয়ে কোনও কারণ ছাড়া।। জানা যায় না আসল কারণটা।। হয়তো জানতে চাই না আমরা।। আর এই রকম কিছু অসমাপ্ত প্রেমের গল্প নিয়ে আমার এই বিশেষ সংস্করণ, অধুরি কাহিনী।। প্রথম লেখা শুরু ২০১৮ সালে, গল্প “পুজোর প্রেম”।। আমার খুব কাছের এক বন্ধুর জীবনে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা নিয়ে আমার এই গল্প।।

আমাদের বড় হোয় ওঠা আর এই মোবাইলের  উন্নতি একই সাথে।। এই রকম কেন বললাম এর উত্তর টা গল্প পরলে বুঝবেন আর বুঝবেন আর বুঝবেন আমদের মত ৯০ দশকের প্রথমে যাদের জন্ম।।

মানস।। আমার বন্ধু, ওর অসমাপ্ত প্রেমের গল্প।। গল্পটা শুরু করি এখনকার সময় থেকে।। আমাদের ক্লাব এর দুর্গা পুজো পড়লো ২৫তম বর্ষে।। ।।গত ১০ বছর ধরে আমাদের দুজনের কাঁধে এই পুজো।। এই বছর হয়েত সব থেকে চাপে আছি।। তার দুটো কারন আছে, এক এই বছর পুজোর রজত জয়ন্তী।। দুই এই বছর মানস এর বিয়ে।। শরৎ কালের বিকেল আমি আর মানস বসে আছি ক্লাবের মাঠে।। মানস এর ভিডিও কল এলো, বৈশাখী।। ও কথা বলতে-বলতে উঠে গেল আমার পাশ থেকে।। পড়ন্ত বিকেলে, চোখের উপর ভেসে উঠল দশ বছর আগের একটি ঘটনা।।

ঘটনাটা ২০০৯-এর পুজোর।। আমরা তখন পাড়ার নতুন দাদা।। পূজোর চাঁদা তোলা থেকে প্যান্ডেলের সব দায়িত্ব আমাদের কাঁধে।। তাই পূজোর কটা দিন আমাদের ঠিকানা ছিল ক্লাবে।। কোন-কোন রাতে বাড়ি ফেরা হতনা।। সেই রকমই মহালয়ার আগের দিন রাতে থেকে গেলাম ক্লাবে।। ঘটনা শুরু হল মহালয়ার ভোরে মিস কল দিয়ে।। তখন সবে মোবাইল পেয়েছি হাতে।। সকালে ঘুম থেকে উঠতেই দেখা গেলো ৭-৭টা মিস কল।। খুব চিন্তিও হইয়ে কল ব্যাক করা হল।। বোঝা গেল রং নাম্বার।। ফোনের ওপারে একটি মিষ্টি গলার মেয়ে।। পায়েল।। মানস জিজ্ঞেস করল "কি বাজো"? ওপার থেকে উত্তর এলো "বাজালেই বাজব"।। শুরু হল গল্প।।

পায়েল থাকত কালনাতে।। পুজোর ছুটিতে গিয়েছিল কৃষ্ণনগর এ মামার বাড়িতে।। ফোন কল তখন ও এতটা সস্তা হয়েনী।। মিনিটে ১ টাকা।। তাতে কি এসে যায়? দিন রাত ধরে চলল মন দেওয়া মন নেওয়া।। দুজনেই জানতে শুরু করল একে অপর কে।। ভালোলাগা-মন্দলাগার কত সব গল্প।। চাপ বাড়ল আমার উপর।। কারণ পুজোর বাকি ছিল আর ৫ দিন আর বাবু মজেছিল প্রেমে।। সেই পুজোতে সব সামলাতে হয়েছিল আমাকে, যতই হোক বন্ধু বলে কথা।।

দিনটা ছিল দ্বিতীয়া, হাওয়াতে ছিল পূজোর গন্ধ।। আমি আর মানস বসে আছি ক্লাবের মাঠে।। আমি প্যান্ডেল তৈরি দেখছিলাম।। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম মানস খুব চিন্তিত।। জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে? বলল, "ভাই ভালবেসে ফেলেছি ওকে।। কি করব বুঝতে পারছি না"।। আমি বললাম, বলেছিস ওকে?  বলল, না।। বললাম, "কল কর আর মনের কথাটা বল"।। দিনটা আজও মনে আছে, শরৎকাল পড়ন্ত বিকেল কমলা আকাশে পেঁজা তুলো খেলা।। দুজন এ নিলো প্রেমের প্রতিজ্ঞা।। ঠিক করলো নিজেদের ভালবাসার নাম।। "মানু-পুল”।।
আচ্ছা বলাই তো হয়নি, মানু আমাদের হিরো, থাকতো দুর্গাপূরে।। তাই "পুলু-মানু" র প্রেমর দূরত্ব প্রায় ১৫০ কিলোমিটার।। অবশ্য দুজনের বয়েশের আন্তর ছিল মাত্র ২ বছর।। মানু পড়ত ক্লাস ১২, আর পুলু ক্লাস ১০।। চতুর্থীর দুপুর, আমি আর মানু স্কুল এ।। স্কুল এর শেষ দিন।। হঠাৎ এসে বলল পূজোতে একদিন কৃষ্ণনগর যাবো তুই যাবি? এত দূর যাবি কি করে? আমি কিছু চিনি না।। ঘরে বলব কি? পূজোতে প্যান্ডেলে কাজ আছে।। আমাকে চুপ করিয়ে পকেট থেকে ডাইরি বের করে সব প্লানটা বলল।। আমি ও আর না করতে পারলাম না, বললাম চল।।

ঠিক হল যাবো ষষ্ঠীতে।। যাবো যাবো বলে আনন্দে দুদিন ঘুম হল না আমার।। আর মানুর  ঘুম হল না তার পরির সাথে গল্প করেতে করতে।। যাই হোক এলো ষষ্ঠী, মা এলো নৌকা তে।। সাথে এলো বৃষ্টি, গভীর নিন্মচাপ।। মেঘ জমেছে আমার মনে।। আর ওদের কথা হতে লাগলো ফোনে।। বৃষ্টি হল দুদিন, সম্পর্কের জল গড়াল অনেক।। অষ্টমী র বিকেল, সোনালি রোদ আর মেঘের খেলা।। পূজোর দিনগুলোর বিকালে খেলার মাঠ পুর ফাঁকা থাকে, দুদিন বৃষ্টি আর পূজো নিয়ে পাগল হয়ে উঠে ছিলাম।। একটু শান্তি তে বসার জন্য আমি বসে আছি মাঠে।। মানু বাবু এলেন পুলুর সাথে কথা বলতে-বলতে।। আমি বকার মত বসে, মনে হল আমি কোনও অদৃশ্য প্রাণী।। ওদের একথা-ওকথা প্রায় শুনছিলাম বিরক্ত হয়েই।। হঠাৎ ফোনে মানস বলে উঠলও "বিয়ের পর রান্না করে কি খাওয়াবে?" ওপাশ থেকে উত্তর  এলো "ভাত, আলু-সেদ্ধ আর কিস..."।। আমি বললাম, তোদের তো দেখাও হইনি, তাও এত? মানু বলল: ফোনের ভেতর উঠল জমে মনের যত কথা।। নয়ন তারায় নিয়েছে ঠাই নাই বা দেখা।। মনের ভেতর আলতো দোলা চাইছি আমি যাকে।। মা দুর্গার বিদায় বেলায় পাবোই  আমি তাকে।।

অষ্টমীর রাত বৃষ্টি একটু ধরল।। ঠিক হলো নবমী সকালে পুলুর কাছে যাব।। সেই মত প্লানও তৈরি হল।। কিন্তু সকাল থেকে পুলুর ফোন অফ।। চিন্তা আর উদ্বেগে কাটলো সারা সকালটা।। ফোন অন হলো দুপুরে, ফোন ধরলো পায়েল এর মামা।। এক কথা দুকথা থেকে শুরু হলও কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ।। কথা বন্ধ হল মানু পুলুর।। নবমীর বিকেল।। মন খারাপ করে বসে আছি আমরা দুজনে।। এক অজানা নম্বর থেকে ফোন।। পুলু।। ওর বন্ধুর ফোন থেকে কল করেছে।। কথা হল কিছুক্ষণ।। পুলু কেঁদে বলল, "বাড়িতে সবাই জেনে গেছে।। কেউ সম্পর্ক মেনে নীতে রাজি নয়।। বিয়ে করবে আমায়?" মানস আর আমি শুনে স্পিক টি নট।। বধায়ে সেই বয়সে কিছু বলার মত ছিলও না।।

দশমীর সকাল।। মা গেলো দোলা তে।। দুলিয়ে দিয়ে গেল মানু-পুলুর জীবন।। শেষ এসএমএস এলো পুলুর কাছ থেকে।। 

"I inhaled you through my eyes, 

but could not exhale you from my mind.

 Will miss u..., ভালো থেকো"।। 

আর কোনো দিন দেখা হয়ে ওঠেনি মানু-পুলুর।। আস্ততে-আস্ততে পুলু হারিয়ে গেছে মানুর মন থেকে।। পরে ওই নম্বরে অনেক বার কল করে ফোন অফ পাওয়া গিয়েছিল।। জানিনা কেমন আছে পুলু? মনে আছে কি তার মানু কে? বিয়ে করেছে কি? আজ মনে এত প্রশ্ন একটা কারণে উঠল।। আজ  মানস এর বিয়ের কার্ডটা হাতে পেলাম।। আজ ১০ বছরএ অনেক দুর্গা পূজো পেরিয়েছে।। অনেক প্রেম হতে দেখেছি হারাতেও দেখেছি।। কিন্তু আমার কাছে সত্যি করে পুজোর ভালোবাসা, মানু-পুলু।। দেবীর পক্ষে ভালবাসার শুরু  দশমীতে সব শেষ।।

কিছু আপসোস থেকে গেছে আজও, যদি মানস একটু বড় হত! যদি তখন মোবাইলটা একটু উন্নত হত! 2G বা 3G থাকলেও অন্তত ফেসবুক থেকে পুলুকে খুঁজে বার করা যেত।। অনেক বছর পর আমি আর মানস অনেক খুজেছি ফেসবুকে কিন্তু পাইনি।। আমি জানি যারা গল্পটা পড়ছেন তাদেরও এই রকম চেনা মানু-পুলু থাকতে পারে।। সে মোবাইল হোক বা চিঠি, খুঁজে পাওয়া যাইনি ভালোবাসার মানুষটাকে।। আর সেই সব অসমাপ্ত গল্প নিয়ে আমার এই বিশেষ সংস্করণ আধুরি কাহিনী।।




Share this:

CONVERSATION

2 comments:

  1. গল্পটা পড়ে দারুন লাগলো।
    আরো অনেক নতুন গল্পের অপেক্ষায় রইলাম স্যার।।

    ReplyDelete
    Replies
    1. খুব তারাতাড়ি আসছে পরে গল্প

      Delete